দিনাজপুরের ইতিহাস (প্রাচীনকাল থেকে ১৯৭১)
ড. মাসুদুল হক
প্রাচীন পুরাভূমি ‘পুণ্ড্রবর্ধন’ ও ‘বরেন্দ্রভূমি’র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দিনাজপুর বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের সর্বশেষ জেলা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পূর্বে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার আয়তন ছিল ৩,৯৪৮ বর্গমাইল। ১৯৮৪ সালে নতুন প্রশাসনিক বিন্যাসের ফলে দিনাজপুর অঞ্চল তিনটি জেলায় রূপান্তরিত হয়: দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়। অখণ্ড এই জেলার বর্তমান জনসংখ্যা ৪০ লক্ষের অধিক। ভূ-গঠন অনুযায়ী দিনাজপুর জেলার ভূ-প্রকৃতিকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে: ১) হিমালয় পাদদেশের পলি অঞ্চল; ২) তিস্তা প্লাবিত পলি অঞ্চল এবং ৩) বরেন্দ্র অঞ্চল। বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার ভূমি সাধারণভাবে সমতল। সবচেয়ে উঁচু ভূমি ‘তেঁতুলিয়া’ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯৭ মিটার উঁচু। এটি উত্তরবঙ্গের সর্বাধিক উচ্চতা। জেলার প্রধান নদী আত্রাই, ঢেপা, পুনর্ভবা, করতোয়া, টাঙ্গন, নাগর।
দিনাজপুর জেলার জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে আদি-অস্ট্রালয়েড, ভেড্ড্ডি, মঙ্গোলীয়, আর্য এবং সেমেটিক নৃ-জাতিক গোষ্ঠীর মানুষ। এ জেলার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নৃ-গোষ্ঠী সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুণ্ডা, মাহালী, মুষহর, মালপাহাড়ী, পলিয়া, কোচ, রাজবংশী প্রভৃতি। আর্য-হিন্দু ও উপশাখার মধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য, শূদ্র, কৈবর্ত, কায়স্থ, তাঁতি, কামার-কুমার প্রভৃতি এবং সেমেটিক গোষ্ঠী ও ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মধ্যে রয়েছে সৈয়দ, শেখ, পাঠান, নস্য, শাহ্ প্রভৃতি। হিন্দু সমাজে বিদ্যমান এক সময়কার বর্ণভেদ প্রথা বর্তমানে ততটা প্রকট নয়। মুসলমানদের মধ্যে কিছু কিছু বহিরাগত থাকলেও বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী রাজবংশী, কোচ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সমাজ থেকে ধর্মান্তরিত। রাজবংশী, কোচ ও পলিয়া জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় এককালে বিদ্যমান থাকলেও তারা এখন হিন্দুধর্মে আত্তীকৃত হয়েছে এবং নিজেদের পরিচয় দেয় রাজবংশী হিসেবে। এ জেলায় কিছু সংখ্যক বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীর সাক্ষাৎ মেলে। ধর্মাচরণে আদিবাসী ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু মতাবলম্বী সর্বপ্রাণবাদ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। মুসলিম সমপ্রদায় হিন্দুধর্মের বহু লৌকিক আচার পালন করে। জেলার মধ্যাঞ্চলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এবং অন্যত্র মুসলিম অধিবাসীদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক প্রথা মুসলিম, হিন্দু ও আদিবাসী ভেদে স্বতন্ত্র। তবে নবান্ন, লোকসঙ্গীত-লোকনাট্য প্রভৃতি সাংস্কৃতিক চর্চা পরিবেশনায় ধর্মীয় ব্যবধান পরিলক্ষিত হয় না। এ ক্ষেত্রে সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রয়াস লক্ষণীয়। দিনাজপুর জেলার জনগোষ্ঠীর মূল পেশা কৃষি। ব্যবসা ও শিল্পোদ্যোগ তেমন একটা দেখা যায় না। শিক্ষার হার পঞ্চাশ শতাংশের মতো।
দিনাজপুরের নামকরণের ব্যাপারে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে বুকানন হ্যামিলটনের মতে, গৌড়ের সিংহাসনে অনধিকার প্রবেশকারী ‘দিনওয়াজ’ বা ‘রাজা গনেশে’র সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্পৃক্ততার সূত্রেই জেলার এ নামকরণ। দিনাজপুর জেলা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে মৌর্য শাসনাধীন ছিল। কয়েকজন চৈনিক তীর্থযাত্রী পুণ্ড্রবর্ধন ভ্রমণের সময় বিভিন্ন স্থানে অশোক-স্তম্ভ দেখতে পান। বিশেষত মহাস্থানগড়ে পুরাকালের ব্রাহ্মী অক্ষরে উৎকীর্ণ লিপি আবিষ্কারের ফলে প্রমাণিত হয় যে, এ অঞ্চল মৌর্য শাসনাধীন ছিল। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক থেকে ৫৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই অঞ্চল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীন ছিল বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে। জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার দামোদরপুর গ্রামে প্রাপ্ত পাঁচটি এবং হাকিমপুর উপজেলার বৈগ্রামে প্রাপ্ত একটি তাম্রলিপির মধ্যে দু’টি ছিল প্রথম কুমারগুপ্তের, দু’টি বুধগুপ্তের এবং অপরটি ভানুগুপ্তের শাসনামলের। খ্রিস্টীয় ৭৫৬ থেকে ১১৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ জেলায় পাল বংশের শাসন লক্ষ্য করা যায়। কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রাম চরিতম’ কাব্যগ্রন্থই পাল রাজাদের রাজনৈতিক অধ্যায় ও বরেন্দ্রী সম্বন্ধে অবগত হওয়ার প্রধান উৎস। এ গ্রন্থের কবি প্রশস্তিতে বলা হয়েছে যে, বরেন্দ্রী দেশ ছিল গঙ্গা ও করতোয়া মধ্যবর্তী অঞ্চলে। এই করতোয়া সপ্তম ও অস্টম শতাব্দীতে বরেন্দ্রীর পূর্বদিক ঘিরে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের পূর্ব সীমা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এই অঞ্চলে পাল রাজারা প্রায় চারশো বছর রাজত্ব করেন। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে সেন বংশীয় নৃপতিদের অভ্যুদয়ের ফলে পাল রাজত্বের অবসান ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই অঞ্চলে সেন রাজত্বকাল। সেন রাজবংশের শেষ উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন লক্ষণ সেন। তিনি বৃদ্ধ বয়সে সিংহাসনে আরোহন করেন এবং তার রাজত্বের শেষের দিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং পতনের লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী অতর্কিতে নওদীও [নদীয়া] আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পূর্ব বাংলায় পালিয়ে গেলে বখতিয়ার নওদীও শহর অধিকার করেন। ১২০৪ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি দিনাজপুর জেলাসহ লখনৌতি রাজ্যের বিস্তৃত অঞ্চল জয় করেন। লখনৌতি রাজ্য বিজয়ের পর তিনি প্রথমে লখনৌতিতে রাজধানী স্থাপন করেন এবং পরে দিনাজপুরের দেবকোটে [কোটিবর্ষ/বাণগড়] দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন। বখতিয়ার নবপ্রতিষ্ঠিত রাজ্যের সুশাসনের জন্যে রাজ্যকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক ভাগে একজন সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত রাজ্যে মসজিদ, খানকাহ্ ও মাদ্রাসা স্থাপন করেন। মধ্যযুগীয় বাংলার যুগ সূচনাকারী ছিলেন বখতিয়ার খিলজী। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দেবকোট শহর থেকে তিনি তার বিখ্যাত তিব্বত অভিযান শুরু করেন। এই অভিযান ব্যর্থ হলে বখতিয়ার খিলজী আবার দেবকোট ফিরে আসেন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় (১২০৬)। তাঁর মৃত্যুর পর মোহাম্মদ শিরান খিলজী এবং আলী মর্দান খিলজী, এ দুই শাসনকর্তা দেবকোটেই রাজত্ব করেন। পরবর্তী শাসনকর্তা সুলতান গিয়াস-উদ-দীন-ই-ওয়াজ খিলজীর শাসনকালের (১২১২-১২২৭) প্রথমদিকেও দেবকোটই ছিল তাঁর রাজধানী এবং পরে তিনি রাজধানী লখনৌতিতে স্থানান্তরিত করেন। বাংলায় ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম মুসলমান আধিপত্যের সূচনাকাল থেকে শুরু করে সুলতান গিয়াস-উদ-দীন-মাহমুদ শাহ্-র রাজত্ব সময় (১৫৩৩-১৫৩৮) পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ কালকে বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে ‘সুলতানি আমল’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এই সুদীর্ঘ সময়ে দিনাজপুর অঞ্চলের অধীনে দেবকোট যে মুসলমান আমলে একটি উল্লেখযোগ্য জনপদ ছিল তা সেখানকার আবিষ্কৃত বিভিন্ন শিলালেখ ও ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রমাণিত হয়েছে।
১৫৩৮ থেকে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে আকবরের বাংলা জয় পর্যন্ত আটত্রিশ বৎসর বাংলা শাসনের ইতিহাসে আফগান বা পাঠান শাসনামল বলে পরিচিত। বাংলায় আফগান শাসনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শের খান সূর। শের খান সূরের নেতৃত্বে আফগান শক্তির পুনরুত্থানের চাপে বাংলায় হুসেন শাহী শাসনের এবং দীর্ঘ দু’শত বর্ষব্যাপী স্বাধীন সুলতানি’র অবসান ঘটে। শেরশাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী ইসলাম শাহের রাজত্বকালে (১৫৪৫-১৫৫৩) দিনাজপুর জেলাসহ বাংলা দিল্লীর অধীনে ছিল। ইসলাম শাহ সেই সময় শামসউদ্দীন মোহাম্মদ সূরকে বাংলার প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে শামসউদ্দীন মোহাম্মদ সূর দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শামসউদ্দীন শাহ গাজী উপাধি ধারণ করেন। এরপর সূর সেনাপতি হিমু কর্তৃক ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে শামসউদ্দীন ‘কালপী’ নামক স্থানে পরাজিত ও নিহত হন। এসময় একটি ভাটির জমিদার ঈসা খান ও সোলায়মান কররানী বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সেই বিদ্রোহের সময় দিল্লীর সুলতান ইসলাম শাহ সূর ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর পরলোক গমন করেন। তার মৃত্যুর পর সূর সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। ১৫৬৪-১৫৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিনাজপুরসহ বাংলা রাজত্ব করেন কররানী বংশ। ১৫৭২ থেকে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে কররানী বংশের শেষ শাসক দাউদ খান
কররানী এবং মুঘল সেনাধ্যক্ষ মুনিম খানের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে দাউদ খান কররানী পরাজিত হয়। দাউদ খান কররানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাফল্যের জন্য মুনিম খান ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের নিকট থেকে ‘খান-ই-খানান’ উপাধি অর্জন করেন। এবং এর মধ্য দিয়েই দিনাজপুরসহ বাংলার অধিকাংশ অঞ্চল মুঘল শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে (১৫৫৬-১৬০৫) সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্য কয়েকটি ‘সুবা’য় বিভক্ত ছিল। ‘সুবা-ই-বাংলা’ ছিল তারমধ্যে অন্যতম। ‘সুবা-ই-বাংলা’ তখন ১৯টি সরকার নিয়ে গঠিত। তারমধ্যে তাজপুর, ঘোড়াঘাট, পাঞ্জরা, বারবকাবাদ ও জন্নতাবাদ (কিছু অংশ), এই পাঁচটি সরকার ছিল বর্তমান দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত। জন্নতাবাদ সরকারের অংশবিশেষ ভারতের গঙ্গারামপুর ও বংশীহারীর অধীনে ছিল। বর্তমান দিনাজপুর জেলার উত্তরাঞ্চল নিয়ে সরকার পাঞ্জরা, পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে সরকার তাজপুর, দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে সরকার বারবকাবাদ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল সরকার ঘোড়াঘাট। মুঘল ও নবাবী আমলের প্রথমদিকেও এসব স্থানের যথেষ্ট প্রাধান্য ছিল। দিনাজপুর নামে সে সময় কিছু ছিল না। ঘোড়াঘাটই ছিল একটি সরকারের শক্তিশালী শাসনকেন্দ্র এবং একটি উন্নত শহর। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি পাঞ্জরা, ঘোড়াঘাট, তাজপুর, বারবকাবাদ ও জন্নতাবাদের অংশবিশেষ নিয়ে দিনাজপুর জমিদারি গঠিত হয়। এ সময়ই দিনাজপুর নামটির প্রচলন হয় এবং ঘোড়াঘাটের গুরুত্ব কমে গিয়ে ক্রমে দিনাজপুর উন্নত জনপদ ও দিনাজপুর রাজ্যের শাসনকেন্দ্রে পরিণত হয়। ষোড়শ শতকের শেষের দিকে কাশী বা মোহন্ত বা গোসাই নামে জনৈক সাধুপুরুষ দিনাজপুর জমিদারির প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত সাধুপুরুষ তার জনৈক শিষ্য শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরীকে জমিদারি দান করেন। শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার দৌহিত্র শুকদেব রায় (১৬৪২-১৬৭৭)-এ জমিদারির দায়িত্ব পালন করেন। সুদীর্ঘ ২৫ বৎসর দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করে ১৬৭৭ খ্রিস্টাব্দে শুকদেব রায় পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তারই দ্বিতীয় পুত্র জয়দেব পাঁচ বৎসর জমিদারি পরিচালনা করেন। জয়দেবের মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই প্রাণনাথ জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ৪০ বৎসরব্যাপী দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন। প্রাণনাথের (১৬৮২-১৭২২) মৃত্যুর পর তার দত্তক পুত্র রামনাথ রায় বাংলার সুবাদারকে ৪,২১,৪৫০ টাকা নজরানা দিয়ে দিনাজপুরের জমিদার হন। কথিত আছে যে, রামনাথ ঠাকুরগাঁয়ের নিকটে গোবিন্দনগর জমিদারি দখল করে স্বীয় জমিদারির অন্তর্ভুক্ত করেন। টাঙ্গন ও পুনর্ভবা নদীর মধ্যে সংযোগকারী রামদাঁড়া খাল, রামনগর (শহর) এবং রামসাগর নামক বিশাল দীঘি নির্মাণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র বৈদ্যনাথ (১৭৬০-১৭৮০) প্রায় ২০ বৎসর এ জমিদারি পরিচালনা করেন। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজা বৈদ্যনাথ নিঃসন্তান অবস্থায় পরলোক গমন করলে তার স্ত্রী সরস্বতী রাধানাথ নামক জনৈক বালককে দত্তকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং নাবালক জমিদারের অভিভাবিকা হিসেবে জমিদারি পরিচালনা করতে থাকেন। একসময় রাধানাথ জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করলেও জমিদারির ইজারাদার দেবী সিংহের তত্ত্বাবধানে জমিদারি চলতে থাকে। এর ফলে প্রজা শোষণ এবং উৎপীড়ন বৃদ্ধি পায়। জমিদারির অবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে প্রায় সম্পূর্ণ জমিদারিই হাতছাড়া হয়ে যায় এবং পাওনাদারদের ভয়ে রাজা প্রকৃতপক্ষে নিজের ঘরেই গৃহবন্দীর জীবন-যাপন করতে থাকেন। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৪ বৎসর বয়সে রাধানাথ পরলোকগমন করেন। রাধানাথের মৃত্যুর পর দিনাজপুরের মহারাজার জমিদারি ক্রমে ক্রমে বিলুপ্ত হয়। রাজা রাধানাথের মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী প্রাণসুন্দরী দত্তক পুত্ররূপে গোবিন্দনাথকে গ্রহণ করেন ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে। রাজা গোবিন্দনাথের মৃত্যু হয় ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে। রাজা গোবিন্দনাথের মৃত্যুর পর দিনাজপুর রাজজমিদারির ভার ন্যস্ত হয় তার পুত্র রাজা তারকনাথের উপর। রাজা তারকনাথের মৃত্যু হয় ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে। রাজা তারকনাথের মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী শ্যামমোহিনী দেবী জমিদারি দেখাশুনার দায়িত্বভার দেবার জন্য দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন গিরিজানাথকে। রাজা গিরিজানাথের মৃত্যু হয় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র জগদীশনাথ দিনাজপুর রাজজমিদারির ভার নেন। রাজা জগদীশনাথের পুত্র জলধিনাথ, তিনি অল্প বয়সেই মারা যান। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের পর জগদীশনাথ সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারত চলে যান এবং ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়।
উল্লেখ্য যে, ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুবা বাংলার প্রশাসনের দায়িত্বভার লাভ করে। দিনাজপুর জেলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনভুক্ত হয়। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর সদরে এসে উপস্থিত হন প্রবল প্রতাপশালী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তত্ত্বাবধায়ক এইচ. কটরেল এবং সেই সঙ্গে সূচিত হয় দিনাজপুর জেলায় ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তন। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফোর্ট উইলিয়ামস্থ প্রধান ভ্যান্সিস্টার্ট-এর রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, এই সময় থেকেই দিনাজপুর শহরের আধুনিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কার্যক্রম সূচিত হয়। লক্ষ্য করবার বিষয় যে, এই সময়ে দিনাজপুর রাজ নামেমাত্র বিদ্যমান থাকে এবং ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজা বৈদ্যনাথের মৃত্যুর পরপরই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কমিটি অব রেভিনিউ দিনাজপুর রাজ পরিবারকে তাদের ভূ-সম্পত্তি দেখাশোনা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এবং দেবী সিংহকে অত্যন্ত চড়াহারে দুই বছরের জন্য মে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে এপ্রিল ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজস্ব বন্দোবস্ত করে। অতিরিক্ত হারে রাজস্ব আদায়ের জন্য দেবী সিংহ দিনাজপুর অঞ্চলে কৃষক ও অন্যান্যদের উপর নানা রকম অত্যাচার ও জোরজবরদস্তি শুরু করলে এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা এবং হিংসাত্মক কৃষক বিক্ষোভ দেখা দেয়। জনগণের বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কালেকটর জর্জ হ্যাচের আগমনে শুরু হয় দিনাজপুর জেলার নতুন যাত্রা। দিনাজপুর একটি প্রশাসনিক জেলায় রূপান্তরিত হয়।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক ও কারিগরদের বিদ্রোহ ঘটে। যা ‘ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার ফকির সমপ্রদায়ের দলপতি শাহ মস্তান বোরহানা উত্তর-বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্রিটিশ-বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন। এই সময়ে মজনু শাহ, দেবী চৌধুরানী, ভবানি পাঠক, পণ্ডিত শাহ প্রমুখ প্রজাবিদ্রোহের ক্ষীণ শিখাটিকে অগ্নিমশালে তেজোদীপ্ত করেন। কথিত আছে যে, মজনু শাহের দলে প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোক ছিল। দিনাজপুরের ফকিরপাড়া, চিরিরবন্দর এবং বোদার অধীন বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলে মজনু শাহের দলের গোপন আড্ডা ছিল। এই দেশপ্রেমিক বিদ্রোহীরা ইংরেজ কোম্পানির কাছে রাজস্ব প্রদানে নিষেধাজ্ঞা জারী করে গ্রামে গ্রামে প্রজাদের মধ্যে বিপ্লবের বাণী ছড়িয়ে দিত। তাঁদের রসদ যোগানোর জন্য দিনাজপুরের জনসাধারণ ডিং খরচা নামে একপ্রকার কর প্রদান করে সহায়তা করতেন। দিনাজপুরের রাণীমাতা সরস্বতী প্রকাশ্যে এই ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহীদের সমর্থন দান করেন।
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের পূর্বে এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রথম যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটেছিল সেটি হচ্ছে মুজাহিদ আন্দোলন। ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত মুজাহিদ বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন সৈয়দ আহম্মদ বেরেলভী। তৎকালীন দিনাজপুরের যুবকদের মধ্যে এই আন্দোলন দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। চিরিরবন্দর এলাকায় মুজাহিদ বিপ্লবের অংশ হিসেবে রাজস্বপ্রদান-বিরোধী আন্দোলন সমগ্র উত্তরবঙ্গের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সেই সময় এই ‘রাজস্বপ্রদান-বিরোধী আন্দোলন’-এর দুঃসাহসিক নেতা ছিলেন তকী মোহাম্মদ সরকার ও মৌলানা শাহ মোহাম্মদ। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ‘ওহাবী আন্দোলন’ গড়ে উঠে। ওহাবী আন্দোলন মূলত মুজাহিদ আন্দোলনের পরবর্তী ধারা। দিনাজপুর অঞ্চলে ওহাবীদের প্রধান আস্তানা ছিল দিনাজপুর শহর। তাছাড়া এই জেলার খোলাহাটি, নয়াবাদ, পাকেরহাট,
চিরিরবন্দর, শিবপুর, বালুরঘাট, পোর্শা, সনগাঁ প্রভৃতি অঞ্চলে ওহাবীদের আস্তানা গড়ে উঠেছিল। দিনাজপুরে ‘ওহাবী আন্দোলন’ কেন্দ্রগুলির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মৌলানা করম আলী শাহ। তার নেতৃত্বে তৎকালীন ইংরেজ-বিরোধী আন্দোলন প্রখরতা লাভ করে।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের প্রতি এই জেলার মানুষের প্রবল সমর্থন ছিল। দিনাজপুরে গোপনে কয়েকজন মৌলানা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে জেলাবাসীদের বিদ্রোহের পক্ষে জাগিয়ে তোলেন। বিদ্রোহের সময় দিনাজপুরের কয়েকজন মৌলানাকে ব্রিটিশ সরকার আটক করে। তাদের নিকট বিদ্রোহ সংক্রান্ত কয়েকটি চিঠি পাওয়া যায়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর রাতে দিনাজপুরের পূর্ব সীমান্তে জলপাইগুড়ির একাদশ অনিয়মিত অশ্বারোহী সিপাহীদল আকস্মিকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং এ অশ্বারোহী বাহিনীর একজন রিসালদারসহ ৫০ জন অশ্বারোহী সেনা দিনাজপুরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এই সময় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ই ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন ফ্রায়ারের নেতৃত্বে কোম্পানির নৌসেনারা দিনাজপুর জেলায় সেনাছাউনী স্থাপন করে। বিদ্রোহী একাদশ অনিয়মিত অশ্বারোহী সিপাহীদল গ্রামবাসীদের কাছ থেকে দিনাজপুরে কোম্পানির নৌসেনাদের আগমনের খবর পেয়ে তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে মালদহের দিকে অগ্রসর হয়। অতঃপর ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১লা নভেম্বর রাণী ভিক্টোরিয়া এক রাজকীয় ঘোষণায় এ জেলাসহ ব্রিটিশ ভারতবর্ষের শাসনক্ষমতা স্বহস্তে গ্রহণ করে। এর ফলে দিনাজপুরে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত দিনাজপুর জেলার শিক্ষা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ১৮০৭-১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর জেলাতে ১৯টি পাঠশালা ছিল হিন্দু-মুসলমান ছাত্রদের জন্য। ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে মিড্ল ভার্নাকুলার স্কুল (বাংলা স্কুল); ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর জিলা স্কুল; ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে গালর্স স্কুল; ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর সংস্কৃত মহাবিদ্যালয় এবং ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে রাজবাড়ি এলাকায় প্রতিষ্ঠা পায় জুবিলি মিড্ল ভার্নাকুলার স্কুল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে দিনাজপুর জেলায় শিল্প-সাহিত্য চর্চায় নাট্যপ্রতিষ্ঠান, প্রেস ও পত্রিকার সংযোজন ঘটে। দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজানাথ রায় ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে ‘কহিনুর থিয়েটার’ নামে একটি নাট্যসংস্থা স্থাপন করেন নিজের রাজবাড়িতে। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে সৃষ্টি হয় দিনাজপুরের দ্বিতীয় নাট্যসংস্থা ‘ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটার কোম্পানি’। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে শহরের গরুহাটি এলাকায় স্থাপিত হয় দিনাজপুরের প্রথম ছাপাখানা ‘সেনপ্রেস’। সে বছরই সেখান থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে মাসিক ‘দিনাজপুর পত্রিকা’। ঐ বছরই দিনাজপুরে কর্মরত বৃটিশ অফিসার-কর্মচারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘স্টেশন ক্লাব’। এছাড়া দিনাজপুরের স্থানীয় উন্নয়নের জন্য স্থাপিত হয় ‘দিনাজপুর মিউনিসিপ্যালিটি’ (১৮৬৯) ও ‘দিনাজপুর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড’ (১৮৮৭)। স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য স্থাপিত হয় ‘দিনাজপুর ডিসপেন্সারি’ (১৮৬২); ‘দিনাজপুর পুলিশ হাসপাতাল’ (১৮৭২) এবং ‘দিনাজপুর সদর হাসপাতাল’ (১৮৭২)।
উল্লেখ্য যে, উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ থেকে দিনাজপুর জেলায় চালু হয় ডাকহরকরা ব্যবস্থা। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের শেষে স্থাপিত হয় টেলিগ্রাফ লাইন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেল কোম্পানি’র অধীনে পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুর শহর পর্যন্ত এবং ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কাটিহার পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে এজেলায় শুরু হয় রেলযাত্রী পরিবহন। দিনাজপুর শহরের সঙ্গে কলকাতার সরাসরি স্থলপথ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এতে করে কলকাতা কেবল রাজা-মহারাজাদের নয়, মধ্যবিত্তেরও নাগালের মধ্যে চলে আসে। ফলে আধুনিকতার সঙ্গে দিনাজপুরের জনগণের প্রত্যক্ষ ও সার্বজনীন আদান-প্রদানের প্রাথমিক সূত্র রচিত হয়।
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে নিখিল ভারত কংগ্রেস গঠিত হলে ১৮৯০ সালে দিনাজপুরে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির শাখা গঠিত হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন শ্রী মাধব চট্টোপাধ্যায়, শ্রী পরমেশ্বর দাঁ, শ্রী রাখাল সেন। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গভঙ্গ’ আইন পাশ হলে দিনাজপুরে এক চরম উত্তেজনা ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। রাখী বন্ধনের নামে বিশাল জনসভায় তৎকালীন দিনাজপুরের হাজার হাজার হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান ঐ সভায় যোগ দিয়ে এক মহামিলন জনসমুদ্রে অবগাহন করে এবং ঐদিন দিনাজপুরে হরতাল পালিত হয়। ‘বঙ্গভঙ্গ’ আন্দোলনের পর ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে সারাবিশ্বে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি সূচিত হলে দিনাজপুরেও ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। সেই সময়ে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন বিপিনচন্দ্র পাল ও শ্রী রাম বিনোদ। তারপরেই দিনাজপুরের ডায়মন্ড জুবিলি হলে এক রাজনৈতিক সভায় কৃষক নেতা এ.কে ফজলুল হক বক্তৃতা করেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুরের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের আগমন। কংগ্রেসের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পাশাপাশি ঠিক সেই সময়ে দিনাজপুরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘খেলাফত আন্দোলন’ বেগবান হয়। এর নেতৃত্ব দেন মৌলানা একিনউদ্দীন আহম্মদ, মৌলানা ওয়াহেদ হোসেন, মৌলানা কাদের বখ্স, মৌলানা আব্দুল্লাহ-হেল-বাকী, মৌলানা আব্দুল্লাহ-হেল-কাফি, মৌলানা আব্দুর রহমান সৈদী, মনির উদ্দীন আনওয়ারী প্রমুখ। ১৯২০-৩০ এর মধ্যে মৌলানা আব্দুল্লাহ-হেল-বাকী’র নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলনের একটি শাখা ‘ওহাবী আন্দোলন’ নামে জমিদারদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়ে ইউনিয়ন বোর্ড স্থাপন ও চৌকিদারী ট্যাক্স ধার্যের বিরুদ্ধে সরাসরি কৃষকদের আন্দোলনে প্রভাবিত করে। এই সময় কৃষক আন্দোলন জোরদার রূপ লাভ করলে দিনাজপুর জেলায় ‘ছত্রিশ আন্দোলন’ সংগঠিত হয়। ‘ছত্রিশ আন্দোলন’ মূলত ছত্রিশ জাতি এবং ছত্রিশ গ্রামের সম্মিলিত সংগ্রাম। যেখানে জমিদার, সুদখোর মহাজন ও ব্রিটিশ আমলাদের অত্যাচার, অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিবাদ গড়ে তোলা হয়। আদিবাসী ও রাজবংশী এই দুই জাতি ছিল এই আন্দোলনের প্রাণশক্তি। এছাড়া দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ, কাহারোল, বোচাগঞ্জ, খানসামা এই চার থানায় ১৯২৪-২৫ এর মধ্যে গড়ে উঠে প্রজার গাছকাটা আন্দোলন। যে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জমিদারের অনুমতি ছাড়া কৃষকদের বসতবাড়ির গাছ কাটার স্বাধীনতা। এই আন্দোলনের পরেই ১৯২৭-২৮ সালের মধ্যে দিনাজপুর জেলার কৃষকরা কর বন্ধের আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের মূল নেতা ছিলেন মৌলানা ফজলে হক। ১৯২৪-৩২ পর্যন্ত দিনাজপুরে গড়ে উঠে চৌকিদারী ট্যাক্স বন্ধের আন্দোলন। এই আন্দোলন জোরদার হয়েছিল বিরল থানায়। এর নেতৃত্বে ছিলেন সাঁওতাল সর্দার পাড়ু হাঁসদা। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় কৃষকপ্রজা পার্টি গঠিত হলে দিনাজপুরেও এর শাখা গঠিত হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন মৌলানা আব্দুল্লাহ-হেল-বাকী ও মৌলানা ফজলে হক। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে লখনৌ শহরে অনুষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলন। যার ফলে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা পায় বাংলার ‘কৃষক সমিতি’। ১৯৩৭-৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই দিনাজপুরের গ্রামে গ্রামে ‘কৃষক সমিতি’ কার্যকর ছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন কালী সরকার, সুশীল সেন, বসন্তলাল চ্যাটার্জ্জি, অজিত রায়, জনার্দন ভট্টাচার্য্য, গুরুদাস তালুকদার, হাজী মোহাম্মদ দানেশ প্রমুখ নেতা। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ‘কৃষক সমিতি’ দিনাজপুরের কৃষক সমপ্রদায়কে নতুন পথ দেখায়। যার ফলে গড়ে উঠে আধিয়ার আন্দোলন। ১৯৩৯-৪৫ পর্যন্ত ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সারাবিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ভারতবর্ষেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এরপর ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে দেখা দেয় ‘মন্বন্তর’। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস দিনাজপুরেও দেখা দেয়। জোতদার-মহাজন দ্বারা
কৃষকরা শোষণ ও বঞ্চনায় ক্লিষ্ট হতে থাকেন। এর ফলে ১৯৪৬-৪৭ সালে ‘তেভাগা আন্দোলন’ তীব্র হয়ে ওঠে। দিনাজপুর জেলায় তেভাগা আন্দোলন জঙ্গীরূপ ধারণ করে। ‘তেভাগা আন্দোলনে’র নেতৃত্বে ছিলেন এই জেলার সুশীল সেন, অজিত রায়, গুরুদাস তালুকদার, হাজী মোহাম্মদ দানেশ প্রমুখ।
১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে এই জেলার প্রখ্যাত নেতা মৌলানা আব্দুল্লাহ-হেল-বাকী মুসলিম লীগে যোগদান করেন। স্থানীয় নেতাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে দিনাজপুরের মুসলমানগণ পাকিস্তান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হয়। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের প্রাদেশিক নির্বাচনে সবগুলি মুসলিম আসনেই মুসলিম লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হন। ফলত ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পায়।
উল্লেখ্য যে বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত দেখা যায়, দিনাজপুর অঞ্চলের সংস্কৃতি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ‘দিনাজপুর নাট্যসমিতি’র বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এই নাট্যসংস্থাটি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪১-এর পূর্বে দিনাজপুরে কোনো কলেজ ছিল না। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত পাক-ভারত উপমহাদেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন কলকাতার রিপন কলেজটি স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হলে দিনাজপুরে ঐ কলেজটির একটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন দিনাজপুরের কৃতি সন্তান রবীন্দ্রনারায়ণ ঘোষ। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ঐ শাখা কলেজটি সুরেন্দ্রনাথ কলেজ নামে প্রতিষ্ঠা পায়, যার অধ্যক্ষ ছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক জি.সি দেব, যা পরে ১৯৬৮ সালে সরকারিকরণের মধ্য দিয়ে দিনাজপুর সরকারি কলেজ নাম ধারণ করে।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশ বিভাগের পর থেকেই সাবেক পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার জনগণের মনে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় শাসক সমপ্রদায়ের বৈষম্য ও শোষণমূলক নীতি ও আচরণের ফলে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ পূর্ব বাংলার মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য একমাত্র উর্দু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার ফলে পূর্ব বাংলার তরুণ, শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী সমাজ পাকিস্তান সরকারের এই একতরফা ও অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন; যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি বলে গণ্য হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও দিনাজপুর অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এই আন্দোলনে জেলায় নেতৃত্ব দেন এস.এ.বারী এটি, নূরুল হুদা কাদের বকস্, দলিল উদ্দীন আহমদ, আসলে উদ্দীন আহম্মদ, আব্দুল হাফিজ, নাসিম চৌধুরী, ফরহাদ আহমদ, দবিরুল ইসলাম, আব্দুল হক, মইনুদ্দিন আহম্মদ, তোফাজ্জল হোসেন তোজা, মাহমুদ মোকাররম হোসেন প্রমুখ।
১৯৪৮-৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কৃষক আন্দোলন অব্যাহত থাকে। দিনাজপুরে ‘তেভাগা আন্দোলন’ আরও জোরদার হয়ে উঠে। এই কৃষক আন্দোলন দমন করার জন্য ‘মুসলিম লীগ’ সরকার কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক আন্দোলনের বহু সহযোগীদের নানা কৌশলে বন্দী করে। এই সময়ে কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশকে দিনাজপুর থেকে বন্দী করে রাজশাহী কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ফলে কৃষকদের মাঝে তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার বিরোধী মনোভাব ক্রমান্বয়ে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে।
১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ঢাকায় পাকিস্তান সরকারের অগণতান্ত্রিক মনোভাব, পক্ষপাতমূলক সরকারী নীতি ও মুসলিম লীগের ভ্রান্ত নীতির প্রতিবাদে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী’র নেতৃত্বে ‘আওয়ামী মুসলীম লীগ’ গঠিত হয়। এরপরেই মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী দিনাজপুরে সাংগঠনিক সফরে এলে দিনাজপুরের রহিমউদ্দীন উকিলের নেতৃত্বে দিনাজপুরে প্রথম বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকারের শোচনীয় পরাজয় ঘটে এবং দেশে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষকপ্রজা পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী পার্টির সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং এ.কে ফজলুল হক প্রাদেশিক আইন পরিষদের নেতা নির্বাচিত হন। এই সময় দিনাজপুরের নেতা ফজলে হক ও রহিমউদ্দীন উকিল এম.এল.এ নির্বাচিত হন।
১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানে সামরিক শাসন প্রবর্তিত হলে দিনাজপুরের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হয়। এরপর ১৯৬০ সালে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ শাসন ব্যবস্থার রীতি পাকিস্তানে প্রবর্তিত হলে অন্যান্য জেলার মতো দিনাজপুরের প্রগতিবাদী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা দুরূহ হয়ে পড়ে। তথাপি ১৯৬১ সালে আইয়ুব সরকার রবীন্দ্রনাথের ‘জন্মশত বার্ষিকী’ উদ্যাপন বন্ধ করে দিলেও এ জেলার প্রগতিপন্থী নেতা ও সংস্কৃতি কর্মীরা তা পালন করেন।
১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পাক-ভারত যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে দিনাজপুরের ছাত্র-ছাত্রী-জনতা মিলিটারি ট্রেনিং, সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং, ফার্স্ট এইড ট্রেনিং, আনসার-মুজাহিদ ট্রেনিং গ্রহণ করেন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা কর্মসূচি পেশ করেন। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় গণজাগরণ। উক্ত ৬ দফা কর্মসূচি জনগণের মাঝে নতুন চেতনা সঞ্চার করে এবং বিক্ষুব্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে তা জনগণকে স্বাধীকারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
শেখ মুজিবুর রহমান উত্থাপিত ৬ দফার দাবীর ভিত্তিতে আন্দোলন ক্রমশ বেগবান হলে ১১ মাস জেলে থাকার পর তিনি (মুজিব) ১৯৬৮ সালের ১৭ই জানুয়ারি বেকসুর খালাস পেলেও পুনরায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের একটি কক্ষে আবদ্ধ থাকেন। যার ফলে জনজীবনে বহু বিক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে থাকে। সেই পুঞ্জিভূত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় ১১ দফার ভিত্তিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এই সময় দিনাজপুরের ছাত্রসহ সকল স্তরের জনতা এই সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন।
১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাস থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে ‘গণআন্দোলন’ ভিত্তিক সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯৬৮’র ৩রা নভেম্বর পল্টন ময়দানের এক জনসভায় বক্তৃতা করেন মাওলানা ভাসানী। তিনি সরকারের তীব্র সমালোচনা করে এক উত্তেজক ভাষণে জনগণকে স্বাধীকারের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান দিনাজপুরে আসেন এবং এক জনসভায় তিনি ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘বিরোধীদলের বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করতেই হবে। কেননা সরকার দেশকে বিভক্ত হতে দিতে পারে না।’ এ থেকেই বাঙালি চৈতন্যে স্বাধীকারের চেতনা প্রবল হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, ১৯৬৮ সালের ১৩ই ডিসেম্বর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে দিনাজপুরসহ সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। এই সময় দিনাজপুরের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও জনতার পাশে এসে দাঁড়ায় এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
পাকিস্তান শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ রাওয়ালপিন্ডিতে রাজনৈতিক নেতাদের গোলটেবিল বৈঠক সম্পন্ন হয়। ঐ বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় ৬ দফা ও ১১ দফা দাবীর ভিত্তিতে স্বায়ত্বশাসনের দাবী উত্থাপন করেন। কিন্তু এই দাবী অগ্রাহ্য হলে শেখ মুজিব বৈঠক বর্জন করেন। এভাবেই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইয়ুব খানের ক্ষমতা রক্ষার শেষ প্রচেষ্টাও বিফল হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। জেনারেল ইয়াহিয়া ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ ক্ষমতা গ্রহণ করে পুনরায় সামরিক শাসন জারী করেন। অতঃপর রাজনৈতিক দলগুলোর দাবীর
প্ররিপ্রেক্ষিতে এক বেতার ভাষণে তিনি প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ঘোষণা করেন। তখন আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা পালন করতে থাকে। এই সময়ে দিনাজপুরের শিল্পী-সমাজ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে দিনাজপুর ইনস্টিটিউট মাঠে প্রায় প্রতিদিন নানাপ্রকার চেতনা-জাগানিয়া গণসঙ্গীত, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিবেশন করে। এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলো ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৩রা মার্চ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ তারিখে এক ঘোষণার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান স্থগিত ঘোষণা করেন। ফলে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে ব্যাপক স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক দেন।
নজিরবিহীন হরতালে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান যখন স্তব্ধ হয়ে যায় তখন ইয়াহিয়া খান ও পরে জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকায় আগমন করেন। আলোচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর চাপে ইয়াহিয়া খান ও সামরিক আমলারা জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে এবং রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও আলোচনার প্রচ্ছন্ন ছত্রছায়ায় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। অবশেষে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে মার্চের মধ্যরাতে ঢাকা এবং প্রায় সবকটি জেলা শহরে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ইতিহাসের এক ঘৃণ্য গণহত্যা অভিযান শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার বাসা থেকে বন্দী করে পাকসেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। ফলে শুরু হয় পাল্টা প্রতিরোধ ও মুক্তি সংগ্রাম। দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হত্যা ও নির্যাতনের ভয়ে লক্ষ লক্ষ লোক ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার অবদান ছিল গৌরবময়। সীমান্ত জেলা হিসেবে একদিকে যেমন এ জেলায় হানাদার পাকবাহিনীর লোকবল ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল তুলনামূলকভাবে অধিক; তেমনি তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে অবাঙালি জনসাধারণ এ জেলায় মুক্তি সংগ্রামকে করে তুলেছিল কঠিনতর এবং দীর্ঘস্থায়ী। কিন্তু তা সত্ত্বেও অন্যান্য জেলার মতো এ জেলার সংগ্রামী জনগণ গড়ে তুলেছিল এক শক্তিশালী প্রতিরোধ বাহিনী। সীমান্ত জেলা হিসেবে দিনাজপুর ইপিআর বাহিনীর প্রায় পাঁচশত বাঙালি সদস্য ২৫শে মার্চ দিনাজপুরে অবস্থান করছিল। ফলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অনেকটা সহজতর হয়। মুক্তিযুদ্ধে দিনাজপুরের প্রতিরোধ ও সংগ্রামের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। ২৮শে মার্চ তারিখে সর্বপ্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত প্রায় একশত সদস্যের পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে জনতা, ইপিআর ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সম্মিলিত প্রতিরোধ বাহিনী এক গৌরবময় সংগ্রাম পরিচালনা করে। তারা কুঠিবাড়িতে অবস্থিত ইপিআর বাহিনীর উইং এবং সেক্টর হেডকোয়ার্টার দখল করে নেয়। সেদিন কুঠিবাড়ি দখলের ফলে পাকসেনাদের অনেক অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে একইদিন পাক বাহিনীর সৈন্যরা পুনরায় আক্রমণ চালাবার ব্যর্থ প্রয়াস চালায়। ৩/৪ দিন যাবৎ খণ্ডযুদ্ধে ব্যস্ত থাকার পর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে টিঁকতে না পেরে ৩১শে মার্চ পাকসেনারা রাতের অন্ধকারে দিনাজপুর থেকে পালিয়ে যায়। পথে এদের অনেকেই জনতার হাতে নিহত হয়। কিন্তু ১৩ এপ্রিল পাকবাহিনীর ট্যাংক ও আর্টিলারি বাহিনীর সাহায্যে ব্যাপক আক্রমণ চালালে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। সেদিন সন্ধ্যার পূর্বেই পাকবাহিনী দিনাজপুর পুনর্দখল করে নেয়। তারপর একে একে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন অবস্থানের উপর তাদের আক্রমণ শুরু হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাকবাহিনী বিমান আক্রমণের সাহায্য নেয়। এপ্রিল মাসের ১৭/১৮ তারিখে বিরল এবং ২০/২১ তারিখে কিশোরীগঞ্জ মুক্তিবাহিনীর হাতছাড়া হয়ে যায়। পাকবাহিনী এ সকল এলাকায় প্রবেশ করে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালাতে থাকে। এতদসত্ত্বেও মুক্তিবাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকে। পাকবাহিনীর সঙ্গে তাদের যে সকল সংঘর্ষ হয়েছিল তার মধ্যে ফুলবাড়ি, দেবীগঞ্জ, বীরগঞ্জ, খানসামা, দশমাইল, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ভাতগাঁও, ভুষিরবন্দর, চম্পাতলী, সৈয়দপুর, কিশোরীগঞ্জ, হিলি প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনী ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল। তা সত্ত্বেও এ জেলার মুক্তিপাগল জনতা, ইপিআর বাহিনী এবং পাকবাহিনীর বাঙালি সদস্যগণ ৯ মাস যাবৎ যে প্রচণ্ড প্রতিরোধ এবং মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করেছিল তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, এ জেলার কোনো কোনো অঞ্চল যেমন− ভবনপুর, সমগ্র মুক্তিসংগ্রাম কালেই সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত ছিল।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিগণ সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজুদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সামরিক বাহিনীর এক যুক্ত কমাণ্ডের কাছে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে পাকিস্তানের সেনানায়ক জেনারেল নিয়াজী ঢাকায় রমনা মাঠে আত্মসমর্পণ করেন। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের অবসানে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে দিনাজপুর বাংলাদেশের একটি বৃহৎ জেলায় পরিণত হয়।